সিপিডির গবেষণা

করপোরেট কর চান না ৮২% ব্যবসায়ী, দুর্নীতির অভিযোগ ৭২ শতাংশের

দেশের ৮২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন করপোরেট করহার তাদের জন্য অন্যায্য। ৭২ শতাংশের দাবি কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশের ৮২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন করপোরেট করহার তাদের জন্য অন্যায্য। ৭২ শতাংশের দাবি কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আর ৭৯ শতাংশ কোম্পানি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার অভাবকে তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখিয়েছেন। এছাড়া দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় যে পরিমাণ অব্যাহতির সুযোগ রয়েছে এবং যে পরিমাণ কর ফাঁকি দেয়া হয়েছে, তাতে এনবিআর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ‘হারিয়েছে’ বলে ধারণা মিলেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর লেকশোর হোটেলে এ গবেষণার ফল তুলে ধরে বেসরকারি এ গবেষণা সংস্থা।

গবেষণার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১২৩টি কোম্পানির কাছ থেকে করপোরেট কর এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার ৩৮৯টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাটের তথ্য সংগ্রহ করেছে সিপিডি। ‘ডায়ালগ অন রিফর্ম ইন করপোরেট ট্যাক্স অ্যান্ড ভ্যাট: এ জাস্টিস পারসপেকটিভ ফর এনবিআর’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামীম আহমেদ বলেন, ‘আমরা ইফেক্টিভ রেট (ভ্যাটের কার্যকর হার) বের করেছি, যেটা আসছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। সেটি দিয়ে আমরা দেখেছি, আমাদের অ্যাকচুয়াল ভ্যাট আদায় কত আসা উচিত। মানে ভ্যাট আদায় যত হয়েছে সেটা বাদ দেয়ার পরও সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার মতো আসছে।’”

গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআর আদায় করেছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। তবে সে সময়ে ভ্যাট বাবদ ৩ লাখ ২০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে আসার ‘সম্ভাবনা’ ছিল। বাকি অর্থ কর ফাঁকি ও অব্যাহতির জন্য এনবিআর ‘হারিয়েছে’ বলে গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। দেশের ভ্যাট আইন অনুযায়ী স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ করা হলেও বর্তমানে অনেক পণ্য ও সেবায় অব্যাহতি রয়েছে। সেসব হিসাব করে সিপিডি দেখিয়েছে, বর্তমানে ভ্যাটের কার্যকর গড়হার হলো ১১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামীম আহমেদ বলেন, ‘এনবিআরে ডাটা আনতে গেলে দুঃখজনকভাবে আমার কাছেও ঘুস দাবি করা হয়েছিল।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অংশগ্রহণকারী ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, জটিল ভ্যাট আইন তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া অস্পষ্ট ভ্যাট নীতিমালা, কর কর্মকর্তাদের সীমিত সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ঘাটতি, পণ্য ও সেবার শ্রেণীবিন্যাসে জটিলতা এবং উচ্চ অনুবর্তন ব্যয় ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালের তথ্য নিয়ে এ গবেষণা করা হলে ভালো হতো–এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট নিরীক্ষা) সৈয়দ মুসফিকুর রহমানের এমন মন্তব্যের জবাবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন,”‘আমরাও চেয়েছিলাম ২৫ সালের ডাটা নিয়ে গবেষণা করতে। কিন্তু আনফরচুনেটলি এনবিআরে তথ্য চেয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।’ তবে কোন ধরনের বিড়ম্বনার মুখে পড়েছিলেন তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান আলোচনার এক পর্যায়ে স্বীকার করেন, এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘুস নেয়ার প্রবণতা আছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে তারা কাজ করছেন।” তিনি বলেন, ‘ভ্যাটের আইন-কানুন কঠিন, এ কথা আসলেই সত্য। ১৯৯১ সালে ভ্যাট আইন করা হলো। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। কোম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর আয়কর আর টার্নওভারের ওপর ভ্যাট—এটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।’

ন্যূনতম করকে কালাকানুন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই, নিঃসন্দেহে ন্যূনতম কর একটা কালাকানুন। এটা স্বীকার করতেই হবে। বিজনেসে কর হবে মুনাফার ওপর। তা না করে মিনিমাম কর নির্ধারণ করছি। সমস্যা হচ্ছে এগুলো ঠিক করতে গেলে আমাদের কর আহরণ কমে যাবে।’

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের অডিট রিপোর্টের কোয়ালিটি নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। অডিটের ঘোষণাগুলো দেখলে বোঝা যায় এখানে প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনি। বর্তমানে এনবিআরে অডিটের ম্যানুয়াল সিলেকশন বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ অডিট ম্যানুয়াল সিলেকশন হলে একই ব্যক্তি প্রতি বছর অডিটের আওতায় পড়ে যায়। এটা এখানেও এক ভাই অভিযোগ করল। আমরা বলেছি অডিট সিলেকশন হবে ঝুঁকিকে ভিত্তি করে। এ কারণে আমরা যতদিন পর্যন্ত ডিজিটাল সিস্টেম করতে না পারব, ততদিন ম্যানুয়াল ভ্যাট অডিট বন্ধ থাকবে। দরকার হলে কেয়ামত পর্যন্ত অডিট বন্ধ থাকবে। আমাদের অটোমেটেড করতেই হবে।’

এনবিআর চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘আমরা যে পরিমাণ ঋণ করেছি, আমাদের পরের প্রজন্মের ওপর যে পরিমাণ চাপিয়ে দিচ্ছি; যদি আমরা যথেষ্ট পরিমাণ কর আদায় করতে না পারি তাহলে বিপদ আছে।’

কর-জিডিপি অনুপাত ক্রমান্বয়ে কমছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা খুবই আশঙ্কাজনক। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও তার দলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তারা বললেন, পাকিস্তানের কর-জিডিপি অনুপাত ১২ দশমিক ২। আর আমাদের গত বছর ছিল ৭ দশমিক ৪। এ বছর (২০২৪-২৫) আরো কমে গেছে। ৬ দশমিক ৬ হয়ে গেছে। এটা দিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ ও দেশের উন্নয়ন করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের।’

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা অনেক ছাড় দিয়েছি। আমাদের অনেক বড় দেশ। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করতে হয়। আগে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বলেছি—আপনারা আসেন কর দিতে হবে না। করছাড় এত ব্যাপক হয়েছে আমরা কোনোভাবেই কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে পারছি না।’

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘সার্বিকভাবে সমন্বিত অটোমেশন না হলে শুধু এনবিআরকে ডিজিটাল করে সুফল পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক, রাজউক, বিআরটিএসহ সরকারি সব দপ্তরেরই অটোমেশন করা লাগবে। তাহলে সহজ সেবা পাওয়া যাবে।’

মুক্ত আলোচনায় সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ব্যক্তির অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। করপোরেটের ক্ষেত্রে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। শিক্ষা ও শিক্ষার ব্যবসা আলাদা করে করের চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।’

আলোচনায় ট্যাক্স বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এএইচ মাহবুব সালেকিন বলেন, ‘কর অফিসে দুর্নীতি একটু বেশি। যদি আমাদের মামলাগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সমাধান করা যেত, তাহলে রাজস্ব আহরণ বেশি হতো। তাহলে বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর করা লাগত না।’

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট জাহিদ হাসান বলেন, ‘করদাতা যখন কোনো কর অফিসে যান, তখন তাকে একটা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে।’

আরও